আমাদের চিন্তা ধারায় যোগ্যতার সংজ্ঞা বদলানো খুব জরুরি চেহারা দিয়ে সমাজের মেরুদণ্ড মাপা বন্ধ করতে

লেখক ডাঃ জুয়েল মাহমুদ সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী
আজকের দিনে যোগ্যতা বলতে বোঝায়—গায়ে আলো ফেলা মুখশ্রী, হাইলাইট করা গাল,আর ইনস্টাগ্রামের ফিল্টারে মোড়ানো ছবি। অথচ একটা সময় মানুষ যোগ্যতা বলতে বুঝতো জ্ঞান,বিবেক,চিন্তা আর চরিত্র।
নারীদের কথা বাদই দিলাম—পুরুষেরাও এখন নিজের স্ট্যাটাস প্রমাণের জন্য বাহ্যিক সৌন্দর্যের পেছনে ছুটছে। এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা ধরে নিয়েছে—এটাই সাফল্যের মাপকাঠি। এর ফলে মেয়েরা বই-খাতা ছেড়ে রিং লাইটের নিচে দাঁড়াচ্ছে।
শিক্ষা নয়—রিলসের ভিউ আর ফলোয়ার এখন তাদের লক্ষ্য। চিন্তা নয়—সাজসজ্জার ঝলকানি, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল আর ফিল্টারই হয়ে দাঁড়িয়েছে সাফল্যের সিঁড়ি।
ভুলটা কোথায়-
সৌন্দর্য অপরাধ নয়, কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন সৌন্দর্যকে মূল যোগ্যতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় সমাজে। কারণ— সুন্দর মুখ সংসার গড়ে তুলতে পারে না।— সুন্দর চেহারা সন্তানকে নীতি-নৈতিকতা শেখাতে পারে না।— গ্ল্যামার দুঃসময়ে কাঁধে হাত রাখতে পারে না।আমরা ভুলে যাচ্ছি—সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী।চোখের জেল্লা একদিন কমে যাবে,ত্বকের দীপ্তি ফিকে হবে, চুলে রূপালি ছোঁয়া আসবে। কিন্তু মানুষের জ্ঞান, চরিত্র, সততা আর মানবিকতা—এসব সময়ের সঙ্গে কমে না, বরং বাড়ে।যারা রূপ ও মোহের উপর জীবন দাঁড় করায়, ক্ষয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের পর তাদের দেওয়ার মতো কিছুই সমাজে থাকবে না। তারা হবে অন্তঃসারশূন্য মাকাল ফল—বাহিরে সুন্দর, ভেতরে ফাঁপা।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—
আমরা কেন প্রজন্মকে শেখাচ্ছি না যে, যোগ্যতার আসল মাপকাঠি হলো শিক্ষা,মননশীলতা,স্বাবলম্বিতা আর দায়িত্ববোধ। আমরা কেন ছেলেদের শেখাচ্ছি না যে, নারীর মুখশ্রী নয়—তার চিন্তা, তার স্বপ্ন, তার ক্ষমতাই আসল সম্পদ। যতদিন না, আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারি, ততদিন আমাদের সমাজ বাহ্যিক চাকচিক্যে ভরা হলেও ভিতরে ফাঁপা থাকবে। একদিন সুন্দর মুখের ভিড়ে সুন্দর মন খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। সংসার গড়ার থেকে ভাঙার প্রতিযোগিতা বাড়বে।
সময় থাকতে আমাদের দৃষ্টি বদলাতে হবে-
শেখাতে হবে—সুন্দর মুখ নয়, সুন্দর মন, চিন্তাশীল হৃদয়, মানবিক চরিত্র আর বাস্তব জীবনে টিকে থাকার মেরুদণ্ডসম্পন্ন মানুষ—এটাই প্রকৃত যোগ্যতা। আর যেদিন একজন নারীর মুখের আলোর চেয়ে তার চিন্তার আলো পুরুষের চোখে বেশি মূল্য পাবে, সেদিনই সমাজে সৌন্দর্য ও যোগ্যতার মধ্যে সত্যিকার ভারসাম্য ফিরে আসবে। কারণ বাহ্যিক সৌন্দর্য ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জ্ঞান, চরিত্র আর মানবিকতা—চিরন্তন সম্পদ। সঠিক সম্পদের চর্চা করলেই সঠিক সমাজ সৃষ্টি হবে, আর আজকের নারী-পুরুষই হয়ে উঠবে আগামীর সু-সন্তান তৈরির পাঠশালা।



