একদিনে ৪,৬৯৩ স্বাক্ষর: নির্বাচন ব্যবস্থার কঠিন বাস্তবতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন

চীফ রিপোর্টার আজিজুল হক
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত শর্তগুলোর একটি হলো নির্দিষ্ট সংখ্যক ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষর সংগ্রহ। আইন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের মোট ভোটারের একটি নির্দিষ্ট অংশের স্বাক্ষর জমা দিতে হয়। ঢাকা-৯ আসন—যার আওতায় খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা এলাকা অন্তর্ভুক্ত—সে হিসেবে এই সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৪,৬৯৩ জন ভোটারের স্বাক্ষর।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবে এই শর্ত কতটা বাস্তবসম্মত?একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছেন, নির্ধারিত ডেডলাইনের আগে হাতে রয়েছে মাত্র একদিন সময়। এই স্বল্প সময়ে হাজার হাজার ভোটারের সঙ্গে যোগাযোগ, তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই এবং আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর সংগ্রহ—সব মিলিয়ে এটি যে কতটা কঠিন কাজ, তা সহজেই অনুমেয়।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতা-রাজনৈতিক দলগুলোর রয়েছে সংগঠিত কাঠামো, মাঠপর্যায়ের কর্মী ও দীর্ঘদিনের নেটওয়ার্ক। বিপরীতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করেন ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক মাধ্যম এবং নাগরিক স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর। ফলে স্বাক্ষর সংগ্রহের মতো একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়াই অনেক সময় হয়ে দাঁড়ায় প্রধান বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শর্ত রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নামে বাস্তবে অনেক যোগ্য ও জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর পথ রুদ্ধ করে দেয়। বিশেষ করে বড় শহরের আসনগুলোতে, যেখানে ভোটারের সংখ্যা বেশি এবং জনসংযোগ জটিল।
নাগরিক অংশগ্রহণের আহ্বান-উক্ত প্রার্থী খিলগাঁও ও সবুজবাগ এলাকায় দুটি বুথ স্থাপন করে নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। বুথগুলো হলো—বুথ ১: খিলগাঁও তালতলা মার্কেট সংলগ্ন, ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজের বিপরীতে
বুথ ২: বাসাবো বালুর মাঠ, সবুজবাগ-ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর সঙ্গে নিয়ে এসে স্বাক্ষর দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।
গণতন্ত্রের প্রশ্ন-এই উদ্যোগ কেবল একজন প্রার্থীর প্রচেষ্টা নয়; এটি বৃহত্তর অর্থে নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের একটি পরীক্ষা। ভোট দেওয়ার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পছন্দের প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ করে দেওয়াও গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।
একদিনে ৪,৬৯৩ স্বাক্ষর সংগ্রহ সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করছে এলাকাবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতার ওপর। তবে এই ঘটনাটি আবারও প্রশ্ন তুলছে—নির্বাচনী আইন কি সত্যিই সমান মাঠ নিশ্চিত করছে, নাকি তা অজান্তেই স্বতন্ত্র রাজনীতিকে কোণঠাসা করে ফেলছে?
গণতন্ত্রের শক্তি কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব অংশগ্রহণেই তার সার্থকতা। সেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচন ব্যবস্থার এই বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোর দিকেও নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।



