শ্রমের বাজার থেকে মেধার বিশ্বে: বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রবাসীদের পরিচয়

চিফ রিপোর্টার আজিজুল হক
একসময় 'প্রবাসী বাংলাদেশি' বলতেই চোখের সামনে ভেসে উঠতো মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে কঠোর পরিশ্রম করা অদক্ষ শ্রমিকদের ছবি। দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু গত এক দশকে এই চিত্রে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। শ্রমনির্ভর প্রবাসীর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশি মেধার এক নতুন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর শ্রেণি। তারা কেবল কঠোর পরিশ্রম নয়, নিজেদের মেধা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং দক্ষতা দিয়ে বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।
দক্ষ পেশাজীবীদের উত্থান:
এখন আর শুধু নির্মাণ শ্রমিক বা ক্লিনার হিসেবে নয়, বাংলাদেশিরা এখন বিশ্বের নামীদামি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র, হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে কাজ করছেন। সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে ইউরোপের বিখ্যাত গবেষণা ল্যাব—সবখানেই বাংলাদেশি তরুণদের জয়জয়কার। গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টগুলোতে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের উপস্থিতি এখন চোখে পড়ার মতো।
শিক্ষাই যখন মূল চাবিকাঠি:
এই পরিবর্তনের মূল কারণ শিক্ষা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন স্থায়ীভাবে সেসব দেশে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়ছেন। তারা পিএইচডি গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছেন। এই 'ব্রেইন ড্রেন' নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, সত্য হলো—তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন এবং তাদের অর্জিত জ্ঞান দেশের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্য:
শুধু চাকরি নয়, প্রবাসে ব্যবসা-বাণিজ্যেও বাংলাদেশিরা দারুণ সফল। লন্ডনের কারি ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে মালয়েশিয়া বা দুবাইয়ের বড় বড় কনস্ট্রাকশন ফার্ম—অনেক কিছুর মালিকানায় এখন বাংলাদেশিরা। তারা বিদেশের মাটিতে কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, যা এক অনন্য অর্জন।
নতুন প্রজন্মের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:
দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসীরা, যারা বিদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন ও বড় হয়েছেন, তারা মূল ধারার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও জায়গা করে নিচ্ছেন। তবে তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো দেশের শেকড়ের সাথে সংযোগ রাখা।
বাংলাদেশের এই বদলে যাওয়া প্রবাসীদের গল্প এখন আর শুধু করুণ সুরের নয়, বরং তা অনুপ্রেরণার। তারা প্রমাণ করছেন, সুযোগ পেলে বাংলাদেশিরা যেকোনো প্রতিকূল পরিবেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারেন। এই মেধাবী প্রবাসীদের সাথে দেশের সংযোগ আরও দৃঢ় করা গেলে, তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। প্রবাস এখন তাই শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নয়, বরং 'নলেজ ট্রান্সফার' বা জ্ঞান বিনিময়ের এক বিশাল সম্ভাবনার দ্বার।



